ভৌতিক গবেষণা পর্ব-৬
মুখের উপর পানির ঝাপটা পরার পর চোখ মেললো রবিন। তাকিয়ে দেখে পাশে লিন্ডো পানির জগ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাথার কাছে আঙ্কেল জনার্দন বাতাস করছে। হাত পা ডলে দিচ্ছে হোজেন চাচা। কথা বলতে যাচ্ছিলো রবিন। কিন্তু কিছু বলার আগেই এক ঝাপটা পানি এসে তার মুখের উপর পড়লো।
“উঠেছে? উঠেছে?” আরো দুই ঝাপটা পানি ছুড়লো লিন্ডো।
“থামো! থামো! লাগছে তো! পানি ছিটাচ্ছ না চাবুক ছুঁড়ছো?” হুড়মুড় করে উঠে বসলো রবিন।
-ব্যথা লেগেছে? বুঝতে পারিনি ভাই। গত আধ ঘন্টা ধরে জ্ঞান হারিয়ে শুয়ে আছো। তাই একটু চিন্তায় পরে গিয়েছিলাম।
“জ্ঞান যে ফিরেছে সেটাই বড় কথা। নেও, একটু পানি খাও।” রবিনের হাতে এক গ্লাস পানি ধরিয়ে দিলো হোজেন।
“এখন বলতো বাবা, তুমি জ্ঞান হারালে কি করে? একা ভয় পেয়েছিলে নাকি?” রবিনের পিঠে বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো হোজেন।
সাথে সাথে একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি মনে পরে গেলো রবিনের। গ্লাসে অবশিষ্ঠ পানিটুকু শেষ করে ভীত চোখে তাকালো লিন্ডোর দিকে। তারপর তার হাত তা চেপে ধরে বললো, “এখানে আর থাকা যাবেনা। এখানে ভূত আছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি।”
লিন্ডোকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো সে। লিন্ডো কিছু না বলে পিঠে রবিনের হাত বোলাতে লাগলো।
রবিন শান্ত হওয়ার লিন্ডো বললো,” এখন ঘরে গিয়ে ভাইয়ার সাথে একটু কথা বলো। ভালো লাগবে। আঙ্কেল জন, তুমি থাকো ওর সাথে। আমি হোজেন চাচার সাথে একটু কথা বলে আসছি। মাথা নাড়লো জনার্দন। তারপর রবিনকে নিয়ে ঘরের দিকে চলে গেলো।
“আচ্ছা হোজেন চাচা, তোমার কি মনে হয়? কাজটা কি আসলেই ভূতের?” সোফায় পা ছড়িয়ে বসলো লিন্ডো।
“সত্যি বলতে আমি ভয় পেলেও ভূতে আমার তেমন বিশ্বাস নেই।” লিন্ডোর পাশে বসলো হোজেন। তারপর বললো, “কিন্তু এখন যা দেখছি তাতে আমার মতটা একটু হলেও পাল্টাচ্ছে।”
-কিন্তু আমি আমার মনে হয় কাজটা চোরেরই।
-আমার তা মনে হয়না। কারণ, এ বাড়িতে চুরি করার মতো কিছুই নেই। ডিউকের ব্যবহার করা সব জিনিস বাড়ির আগের মালকিন বিক্রি করে দিয়েছে। যা আছে সব ভাঙা জঞ্জাল মাত্র।
-আগের মালকিনের নাম কি?
-পুরো নাম জানিনা। সবাই ডাকে মিসেস মিলার।
-আর মিস্টার মিলার? সে কোথায়?
-কে জানে? শুনেছি বিয়ের কয় মাস পর হটাৎ সে উধাও হয়ে যায়। তারপর সব সম্পত্তি হয়ে মিসেস মিলারের।
-ব্যাপারটা ঠিক হজম হচ্ছেনা। আচ্ছা, ডিউক তো শুনেছি স্বপরিবারে মারা যাই। তাহলে মিস্টার মিলার এই বাড়ির মালিকানা পেলেন কি করে?
-তা জানিনা।
মাথা নাড়লো লিন্ডো। “জানতে পারলে হয়তো কোনো ক্লু পাওয়া যেত।” থুতনি চুলটাতে লাগলো সে।
-তবে একজন জানতে পারে।
ঘুরে তাকালো লিন্ডো, “কে?”
-এমা নাম মেয়েটার। তোমাদের বয়সীই। গ্রামের সব খবর ওর কাছে পাওয়া যায়।
-কোথায় পাবো তাকে?
-কোথায় পাওয়া যাবে তা বলা মুশকিল। স্কুল খোলা থাকলে স্কুলে বা লাইব্রেরিতে পাওয়া যায় ওকে। কিন্তু এখন তো গরমের ছুটি চলছে।
“হুম…” মাথা নাড়লো লিন্ডো।
“নেও এখন উঠো। ভোর হয়ে গেলো বলে। একটু ঘুমিয়ে নিও নাহলে সকালে মাথা ধরবে।”উঠে দাঁড়ালো হোজেন। লিন্ডোকে পাঠিয়ে চলে গেলো নিজের ঘরে।
পরদিন রবিনের ঘুম ভাঙলো বেশ দেরিতে। সারা রাত আজেবাজে স্বপ্ন দেখেছে সে। শরীরটাও তেমন ভালো নেই। উঠে বসে গতরাতে লিওর বলা কথাগুলো নিয়ে ভাবতে লাগলো রবিন। ‘ভাইয়া ঠিকই বলেছে। গতকাল লম্বা জার্নির পর রাত জেগে ল্যাপটপ ঘেটেছি। তার উপর ভয় বেশি থাকার কারণে আমার ব্রেন নিজে থেকেই উদ্ভট বস্তু বানিয়ে নিয়েছে। ভূত-টুত সব আসলে আমার কল্পনা।’ নিজ মনে বললো রবিন।
“উঠে গেছো?” ঘুরে তাকালো রবিন। দেখে লিন্ডো ট্রে-তে নাস্তা নিয়ে এসেছে ওর জন্য।
“হুম, একটু আগেই ঘুম ভাঙলো।” উত্তরে জানালো রবিন।
-এখন কেমন লাগছে?
-ভালোই, শুধু মাথাটা একটু ঝিমঝিম করছে।
-স্বাভাবিক, রাতে ঘুমে ছটফট করেছিলে। বঝাই যাচ্ছে ঘুম ভালো হয়নি। নেও, রুটি দুটো খেয়ে নেও। তোমার জন্য এক্সট্রা জ্যাম মাখিয়ে দিয়েছে ইউনা চাচী।
ট্রে-টা বিছানার উপরে রেখে বসলো লিন্ডো। “চা-টা কিন্তু গরম। সাবধানে খেয়ো।”
রুটি শেষ করে চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিলো রবিন। বললো, “তুমিই মনে হয় ঠিক। গতরাতে যা ঘটেছে তা আসলেই চোরের কাজ। ব্রেইনে চাপ পড়ায় উল্টাপাল্টা জিনিস দেখেছি আমি।”
কিছু বললো না লিন্ডো। শুধু মাথা নাড়লো।
“দুপুরে বাড়ির ইলেক্ট্রিসিটির কার করতে আসবে। ভাবছি ওই সময় একটু বের হবো। তুমি যাবে আমার সাথে?” বললো লিন্ডো।
“না।” মাথা ঝাকালো রবিন। “রাতে ভালো ঘুম হয়নি। দুপুরটা ঘুমিয়ে কাটাবো ভাবছি।”
-তাহলে ছাদের দিকের ঘরটায় যায়। নাহলে মেশিনের শব্দে ঘুমাতে পারবেনা।
-ঠিকাছে। তুমি কি তাহলে একাই বের হবে তাহলে?
-হুম, এমা নামের একটা মেয়েকে খুঁজতে যাবো।
-সে আবার কে?
-হোজেন চাচার কোথায় যা বুঝলাম, এমা সাংবাদিকের মতো একজন যার কাছে এই গ্রামের সব খবর পাওয়া যায়।
-তাই নাকি? তা তোমার কি ধারণা? ওই সাংবাদিক গতরাতে আসা চোরের নাম ঠিকানা বলে দিতে পারবে?
-নাম ঠিকানা না পেলেও কিছু একটা তো পাবোই। এই ভুতুড়ে চোরের গুষ্টিউদ্ধার আমাকে করতেই হবে। সাথে মিলার ফ্যামিলির ইতিহাসও।
-মিলার ফ্যামিলি? খুলে বলতো বিষয়টা।
গতরাতে হোজেনের দেওয়া তথ্যগুলো রবিনকে জানালো লিন্ডো। রবিন সব শুনে বললো, “তা না হয় উধাও হয়েছে, কিন্তু তার সাথে এই চোরের সম্পর্কটা কোথায়?”
“সেটা বুঝলে তো তুমি আর রবিন থাকতে না। লিন্ডো নম্বর টু হয়ে যেতে।” বাঁকা হেসে বললো লিন্ডো।
-থাক, আমি বুঝতেও চাইনা। চলো ছাদে যাই। ঘরে থাকতে আর ভালো লাগছেনা।
দুপুর হওয়ার আগেই ইলেকট্রিশিয়ানরা এসে তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। লিন্ডোর আর সহ্য হচ্ছেনা। এতো শব্দের মধ্যেও রবিন ঘুমাচ্ছে কি করে কে জানে। কান চাপা দিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলো সে।
“চাচী, আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। রবিন ছাদের দিকের ঘরটাই ঘুমাচ্ছে। তুমি একটু খেয়াল রাখো।”
“অমন কাকের বাসা মাথায় নিয়েই যাবে? দাড়াও, তোমার চুলগুলো ঠিক করে দেই ।” হাত দিয়ে চুলগুলো আঁচড়ে দিলো ইউনা। “এখন যাও। সন্ধ্যার আগে ফিরে আসবে কিন্তু।”
মাথা নেড়ে বের হয়ে যাচ্ছিলো লিন্ডো। কি ভেবে ফিরে তাকালো ইউনার দিকে।
“আচ্ছা ইউনা চাচী, তুমি এমা নামের কাউকে চেনো?”
-এমা? হুম চিনি।
-তাকে কোথায় পাওয়া যাবে বলতে পারো?
“তুমি কি এমা হার্টফিলিয়ার কথা বলছো?” পেছন থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠ শোনা গেলো। লিন্ডো ঘুরে তাকিয়ে দেখে চব্বিশ কি পঁচিশ বছর বয়সী একটা মেয়ে মিষ্টি করে হেসে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
“সোয়া, এসেছো নাকি?” রান্নাঘর থেকে বললো ইউনা।
“হ্যা মা। ব্রেডক্রাম পাইনি তাই বিস্কিট এনেছি। ওগুলো গুঁড়ো করে নিও।” কিচেন কাউন্টারে বাজারের ব্যাগটা রেখে বললো সোয়া নামের মেয়েটি।
“এ হচ্ছে আমার মেয়ে, সোয়া। এইচআইএস স্কুলের টিচার। আর সোয়া, ও হচ্ছে লিন্ডো। যমজ ভাইয়ের মধ্যে ছোটজন।” পরিচয় করিয়ে দিলো ইউনা।
“আমি লিন্ডো ডেকার্ড।” হাত বাড়িয়ে দিলো লিন্ডো।
“আমি মিন সোয়া। খবরদার! আমাকে কিন্তু সয়াবিন বলে ডাকবেনা। মিস. সোয়া ডাকবে।” হেসে হাত মিলিয়ে বললো মিস. সোয়া।
লিন্ডো মাথা নাড়লো।
-তুমি কি এমার কথা জিজ্ঞেস করছিলে তখন?
-ও হ্যা! তুমি কি জানো ওকে কোথায় পাওয়া যাবে?
-ঠিক বলতে পারছিনা। তবে তুমি পাহাড়ের দিকের জঙ্গলে দিয়ে দেখতে পারো। যতদূর জানি, ছুটির সময়টা ওখানেই কাটাই ওরা।
-ওরা?
-ওরা মানে ওদের দল।
-ওহ, তাহলে আমি বের হই এখন। ওদের খুঁজতে না জানি কত সময় লাগবে।
-আচ্ছা এস তাহলে। আর শোনো, ওই বিচ্ছু দল থেকে সাবধান। ওরা দেখতে শান্তশিষ্ট হলেও আসলে এক একটা ভবিষ্যতের সন্ত্রাসী। বিশেষ করে মিমো নামের মেয়েটা। বুঝেছো?
লিন্ডো কি বুঝলো কে জানে। তাও মাথা নেড়ে জানালো সে বুঝেছে। তারপর বের হয়ে গেলো বাড়ি থেকে।
Comments
Post a Comment