ভৌতিক গবেষণা পর্ব-৭

 জিলং পাহাড়ের ঠিক পাশ থেকে শুরু হয়েছে জঙ্গলটি। ছড়িয়ে গেছে পুরো পাহাড় জুড়ে। জঙ্গলটি যে বেশ গভীর তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বাইরের দিকের কিছু অংশের ঘন্নত একটু কম। সেই অংশেরই একটা মোটাসোটা বট গাছের প্রায় সাত ফুট উঁচুতে একটা ছোটোখাটো ট্রি হাউস।

ট্রি হাউসের ঠিক মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে যেই মেয়েটি ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে একটা বানরের ফল খাওয়া দেখছে তার নাম রিঙ্কা। চারজনের দলের সাব লিডার। এই গ্রামে সে কিশোর বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত। তার আবিষ্কারেরও তুলনা নেই, তবে সমস্যা হলো রিঙ্কার কিছু অদ্ভুত আবিষ্কার আছে যার শিকার হতে হয়ে তার অসহায় বন্ধুদের। আর এই সমস্যার আগুনে ঘি ঢালছে তার পাগলামিতে ভরা মাথা যেখানে সবসময় উদ্ভট আবিষ্কার ঘুরপাক খায়।

ট্রি হাউসের ঝুলন্ত মই ধরে যেই মেয়েটি ঝুলছে তার নাম মিমো। দলের সবচেয়ে ছোট আর চঞ্চল সদস্য। লেখাপড়া, খেলাধুলা, মার্শালার্ট, নৃত্য যাই বলা হোক সবকিছুতেই মিমোর হাত পাকা। চেহারাও খারাপ নয় তার। এক কোথায় সে অলরাউন্ডার। তবে সমস্যাটা হলো, মিমোর মাথায় সুবুদ্ধি থেকে কুবুদ্ধির পরিমানটা একটু বেশি।।

ভৌতিক গবেষণা পর্ব-৭

মিমোর কোমর ধরে যেই মেয়েটি কোয়ালার মতো ঝুলে আছে সে হলো নিকি। দলের সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে। নিকির সবচেয়ে অবাক করা গুনটি হলো তার ল্যাংগুয়েজ স্কিলস। আজ পর্যন্ত প্রায় তেরোটি ভাষা সে লিখতে ও বলতে শিখেছে। তার সমস্যাটি হলো খাওয়ার প্রতি অঢেল ভালোবাসা। একবার খেতে বসলে তাকে থামানোটা হয় প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

নিকিকে নিচ থেকে যেই মেয়েটি প্রানপনে ঠেলে উঠানোর চেষ্টা করছে সে হলো দলটির লিডার এমা। শান্ত ও ঠান্ডা মাথার মানুষ সে। আঁতেলের মতো সারাদিন কিছু না কিছু পড়তেই থাকে। ফার্স্ট না হলেও, সেকেন্ড প্লেসের নিচে তাকে কখনো দেখা যায়নি। গ্রামের সব খবর পাওয়া যাই এই এমার কাছে। দলের সে একমাত্র সদস্য যার মধ্যে কোনো মাইনাস পয়েন্ট নেই।

নিকি মিমোর শার্ট খামচে ধরে বললো, “এতো কিছু তুলতে পারো আর আমাকে পারছোনা? তুমি তো দেখি নিজের নামে ছাই মাখছো মিমো।”
“ওর দোষ কোথায়? তুমি হচ্ছ একটা আলুর বস্তা, আর মিমো হলো শুকনো কাঠি। ও যে তোমাকে নিয়ে এতক্ষন টিকে আছে সেটাই অনেক।” নিচ থেকে বললো এমা। “আমি বুঝলাম না। এতো আলসেমি করলে কি চলে?” হেইও বলে আরো একবার ঠেললো সে।

মিমো আরো এক মই উপরে উঠে বললো, “পটপট শব্দ পাচ্ছি। আমি আবারো বলছি নিকি, এই মই যদি ছিড়ে যায় তাহলে কিন্তু আমি তোমার হালুয়া বানাবো।”
“ওই মহারানী রিঙ্কা করছেটা কি? উপর থেকে তোমাদের টেনে তুলতে পারছে না সে?” এমার প্রশ্ন।
-কে জানে। সেই তখন উঠেছে, তারপর আর কোনো সাড়া শব্দ নেই।
“রিঙ্কা! আমাদের একটু টেনে তুলো তো। মিমোর গায়ে জোর নেই। সে উঠতে পারছে না।” খোটার স্বরে বললো নিকি।
-ওরে আমার লাট সাহেব! একবার আলুর বস্তা পিঠে নিয়ে মই বেয়ে উঠে দেখাও। তখন বুঝবে গায়ের জোর কোথায় যায়।

অনেক্ষন ধরেই তাদের ঠেলাঠেলি, টানাটানি আর ঝগড়াঝাটি চললো। মিমো আর তার পিঠের কোয়ালাটা এখন প্রায় উঠেই পড়ছে ট্রি হাউসে। ঠিক তখন রিঙ্কা মইয়ের সামনে এসে দাঁড়ালো। নিকিকে উদ্দেশ্য করে বললো, “বানররা খুবই একটিভ প্রাণী। এনার্জির কমতি নেই ওদের। কোনোভাবে যদি ওদের সাথে কথা বলা যেত তাহলে আমরাও ওদের মতো একটিভ হতে পারতাম।

“এ কথা আমাকে বলছো যে? আমি কি এতই আলসে যে এখন আমাকে বানরের কাছ থেকে ট্রেনিং নিতে হবে?” কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো নিকি।
“রিঙ্কা, পা সরাও। উঠার জায়গা পাচ্ছি না।” বললো মিমো। কিন্তু কোনো পাত্তা দিলোনা রিঙ্কা।

-আমি কি সে কথা বলেছি নাকি? তুমি হচ্ছ আমাদের ট্রান্স্যুলেটর। তুমি যদি ওই গাছে বসা বানরটার সাথে একটু কথা বলো তাহলে হয়তো জানতে পারবো ঐ এনার্জির সিক্রেটটা।

-আমি শুধু মানুষের ভাষা জানি। পশু পাখি, জন্তু জানোয়ারের ভাষা জানি না।
-জানো না? তাহলে তোমাকে রেখে আর লাভ কি? তুমি তো আমার কোনো কাজেই আসোনা।
-আমি কি তোমার ল্যাবের ইঁদুর-গিনিপিগ যে কাজে আসবো? বানাও তো খালি সব আজগুবি জিনিস। কোনো কাজে আসে সেগুলো?
“রিঙ্কা, পা সরাও।” আগের থেকে একটু জোরে বললো মিমো। কিন্তু এবারও তাকে পাত্তা দিলোনা রিঙ্কা। ওদিকে মইটার অবস্থাও ভালো নয়। যেকোনো মুহূর্তে ছিড়ে পরতে পারে।

-বললেই হলো? কোন জিনিসটা আজগুবি শুনি?
-কোনটা নয় সেটা জিজ্ঞেস করো। দুবছর আগে টাইগার টনিক নাম দিয়ে মিমোকে কি না কি খাইয়েছিলে। দুই মাস বিছানায় পরে ছিল। ওয়াটার রোজ দিয়ে এমার লাইব্রেরি ডুবিয়েছিলে গত বছর। চার মাস আগে তোমার ফ্রগ হপারে চাপিয়ে নদীতে চুবানি খাইয়েছিলে আমাকে। তারপর….
লিস্ট চলতেই থাকলো। এদিকে মিমো রেগে ফুলে যাচ্ছে। “তর্কটা আমার পিঠ থেকে নেমে করলে ভালো হয়।” কোনো মতে নিজেকে ঠান্ডা রেখে বললো সে।
“তুমি চুপ করো তো! দেখছোনা জরুরি বিষয়ে আলাপ হচ্ছে!” বলে মিমোর মাথায় একটা চাটি মেরে দিলো নিকি।

মিমো নিজেকে সামলে রাখলেও মইটা সামলে থাকতে পারলো না। পটপট শব্দের সাইরেন বাজিয়ে ছিড়ে পড়লো মিমো আর নিকিকে নিয়ে। পতনের পর আর যাবে কোথায়? দুজনে সোজা গিয়ে পড়েছে এমার উপর। লাউ পটোলের মতো গড়াগড়ি খেতে লাগলো তিনজনে।

হাত-পা ডোলে ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালো মিমো। অনেক্ষন ধরে রাগ দমিয়ে রেখেছে। আর পারছে না। আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে উঠল সে। “সেই তখন থেকে সহ্য করছি তোমাদের ভুজুংভাজুং। আর না! এতো করে বললাম হয় আমাকে উঠতে দেও বা তর্কাতর্কিটা আমার পিঠ থেকে নেমে করো। মই ছিড়ে যাবে। কিন্তু না! আমার কোথায় কানেই তুললে না।” চেঁচিয়ে উঠলো মিমো।
“এই জন্যই বলি পটলটার খাওয়াটা একটু কমাতে?” নিজের উপর থেকে নিকিকে ঠেলে সরালো এমা। ” তখন কেউ শোনে আমার কথা?”

মিমো ছেড়া মইটা হাতে তুলে নিলো। ওর থেকে দূরে সরে গেলো নিকি। তার কপালে যে ছাল তোলা মার আছে সেটা বুঝতে সময় লাগলোনা। নিজেকে বাঁচানোর জন্য কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো। কিন্তু সেই সময়ও পেলো না নিকি। রেগে যাওয়া ষাঁড়ের মতো তাকে তাড়া করেছে মিমো।
“মানছি আমি আলসে, লাউ-পটল। কিন্তু এই দুর্ঘটনায়ে সম্পূর্ণ দোষটা কিন্তু আমার না। দোষের অংশীদার আর মূল কারণ হলো রিঙ্কা।” বলে প্রানপনে ছুটতে লাগলো নিকি।

“তাহলে পালাচ্ছ কেন আমার থেকে? কাছে এসো। তোমার দোষ ঠিক কতোটুকু সেটা মেপে দেখি।” দাঁত কিটমিটিয়ে বললো মিমো।
-পাগলে পেয়েছো! কাছে যাই আর তুমি আমার ভর্তা ভুজিয়া বানাও। হুহ বাবা… অত সোজা না।
-আমিও দেখি তুমি কতক্ষন দৌড়াতে পারো। একসময় তো থামবেই। তখন দেখব তোমাকে কে বাঁচায়।

এদিকে এমা ব্যথায় কুঁইকুঁই করছে। করবেনাই বা কেন। তিনজনের মধ্যে ওর সবচেয়ে বেশি ব্যথা লেগেছে। “এদের নিয়ে আর পারি না। এইজন্যই আমাদের বলে লিলিপুট সন্ত্রাসী। বদনাম হওয়ার মূল কারণ হলো এই তিন ছাগল।”
মই নেই বলে রিঙ্কাকে পাশের গাছের ডাল ধরে ঝুলে নামতে হলোরিঙ্কাকে। ট্রি হাউস থেকে নেমে এমার পাশে এসে দাঁড়ালো সে। তারপর কপালে হাত দিয়ে বললো, “এই তিন ছাগলকে নিয়ে যে আমি কিভাবে চলি সেটা একমাত্র আমিই বুঝি।”

-ও, তাই বুঝি? তাহলে বলো, একটু আগে হাদার মতো ঝগড়া করছিলে কেন? আর বানরের ভাষা কোনো মানুষকে শিখতে দেখেছো কখনো?
-তাই বলে ও আমার আবিষ্কারের অপমান করবে আর আমি সেটা মেনে নিবো?
-রাখো তো তোমার আবিষ্কার। খুশি হও যে মিমো এখন নিকিকে নিয়ে ব্যস্ত। ওর নজরে পড়লে এতক্ষনে হয়তো তোমার স্থান হতো হাসপাতালের বিছান।
-ও আমার কিচ্ছুটি করতে পারবে না। কাছে আসলে আবার টাইগার টনিকে খাইয়ে ওকে শয্যাশায়ী করে দিবো।

মিমো কি করতে পারে তা নিয়ে এমা একটা লম্বা চওড়া ভাষণ দিতে যাচ্ছিলো কি একটা বিকট অট্টহাসি ওকে থামিয়ে দিলো। মাথা ঘুরে এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলো সে। একটা হ্যাংলা মতো ছেলে কোকোয়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। নিকির মার খাওয়া দেখে অবিরাম হেসে যাচ্ছে। কপাল কুঁচকালো এমা। চেনা নেই, জানা নেই। ওদের দেখে হেসে যাচ্ছে! মেনার্স বলতে কি কিছু নেই ছেলেটার?

ছেলেটার কাছে গেলো এমা আর রিঙ্কা। “অমন অদ্ভুত ভাবে হাসছো কেনো?” কোমরে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো এমা।
হাসি থামালো ছেলেটি। “হাসবো না? এমন বিনামূল্যে সার্কাস দেখে কে না হাসে?” বলে আবার হাসতে লাগলো সে।
এমা কিছু বললো না। অপমানের হলেও কথাটা ঠিক। এই বাঁদরগুলো আজকে বেশ সুন্দর ভাবে তার মান-সম্মানটা ডুবিয়েছে।

“তোমাকে এখানে আগে কখন দেখিনি মনে হচ্ছে। গ্রামে নতুন এসেছো নাকি?” রিঙ্কার প্রশ্ন।
হাসি থামিয়ে চোখের পানি মুছলো ছেলেটি। বললো, “হুম। গতকাল এসেছি এখানে। ‘স্পিরিট হাউস’ নামের বাড়িটায় উঠেছি আমরা।”
এতক্ষনে নিকির ছাতু হওয়া শেষ হচ্ছে। সে আর মিমো এমার পাশে এসে দাঁড়ালো। মিমো গলা নামিয়ে বললো, “গতকাল আমি এদের কথাই বলেছিলাম তোমাদের।”

মাথা নাড়লো এমা। তারপর ছেলেটির দিকে ঘুরে হেসে বললো, “আমি এমা হেইসন। এই চশমিশটা হলো রুফায়দা হক। ইন শর্ট রিঙ্কা।” হেসে হাত নাড়লো রিঙ্কা।
“আমি নিকি হার্টফিলিয়া।” নিজের পরিচয় দিলো নিকি।
“আর আমি মাদ্রিওজেস গঞ্জাল্ভেস। ইন শর্ট মিমো।” হেসে নিজের নামটাও জানিয়ে দিলো মিমো।

“আমার নাম লিন্ডো ডেকার্ড। নো শর্ট ফর্ম।” বলে হাত বাড়িয়ে দিলো লিন্ডো। হাত মিলিয়ে পরিচয় পর্ব শেষ করলো তারা। শুধু নিকি হাত বাড়ালোনা। বাড়াবেই বা কি করে? মিমো যে ওকে ছেড়া মইয়ের দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে রেখেছে।

Comments

Popular Posts