ভৌতিক গবেষণা পর্ব-১২
বাঙলোর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দুই বন্ধু গল্প করছে। বয়স তাদের বিশের কম নয়। অন্ধকার হলেও চাঁদের আলোয় তাদের সুঠাম দেহ আর সুদর্শন চেহারাটি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। তুলনায় খাটো লোকটি হলো নিয়ন গঞ্জাল্ভেস। পেশায় গভর্মেন্ট ইনভেস্টিগেটর। মিমোর ভাষায় গোয়েন্দা। আর অন্যজন লিও ডেকার্ড। পেশায় একজন ক্রিমিনাল লয়ার।
দুই বন্ধুর আজ প্রায় ছয় বছর পর দেখা। তাই যত রাতই হোক না কেন, তাদের গল্প শেষ হচ্ছে না। সেটা অবশ্য মিমোর চিন্তার বিষয় না। ওকে এখন অভিনয়ের জগতে নামতে হবে। নিজেকে নিষ্পাপ দেখানোর অভিনয়ে।
“এখন না গেলে লিন্ডো আর রবিন চিন্তায় পরে যাবে। তাই আজকে তোমাকে ছাড়তে হচ্ছে। নাহলে রাতটা তোমার অফিসেই কাটিয়ে দিতাম।” বলল লিও।
হাসলো নিয়ন। বললো, “তা না হয় ছাড়লে। কিন্তু কালকে আমি তোমায় ছাড়বো না। বাবা তোমাদের তিনজনকে বাসায় দাওয়াত দিয়েছে। বুঝতেই পারছো তোমাকে কতটা ব্যস্ত রাখবে।”
দুই বন্ধু বিদায় নিয়ে যে যার দিকে যাচ্ছিলো। “নিকি! কোথায় তুমি?” একটা মেয়েলি কণ্ঠ তাদের থামালো। ঠিক মেয়েলি নয় । গলায় পুরুষের মতো একটা ভারী ভারী ভাব আছে।
চোখ কুঁচকে ভালো করে দেখলো সে। জঙ্গলের ভেতর থেকে একটা মেয়ে বের হয়ে আসলো। কেমন চেনা চেনা লাগছে মেয়েটাকে। ভালো করে দেখার জন্য লিওকে নিয়ে আরো কাছে গেলো সে। আরে! এ তো মিমো। এতো রাতে এখানে কি করছে? আর অমন ছাগলের মতো চেঁচাচ্ছে কেন।
“এই মিমো।” ডাকলো নিয়ন। নিজের নাম শুনতে পেয়ে ঘুরে তাকালো মিমো। বললো, “আরে বো। এতো রাতে তুমি এখানে কি করছো?”
“সেটা তো আমার প্রশ্ন হওয়া উচিত।” তারপর মিমোর মাথায় একটা গাট্টা বসিয়ে দিয়ে বললো সে, “তোমাকে না ঘুমাতে দেখে আসলাম? এখানে আসলে কি করে? বাবা, কেভিন আর জেন কি জানে যে তুমি এখানে? নাকি আবারো না বলে বের হয়েছো?”
ভেবাচেকা খেয়ে গেলো মিমো। “এ বাবা, এখন বকাবকি শুরু করলে মান ইজ্জত সব ধুলো ধুলো হয়ে যাবে।” নিজ মনে বললো সে।
মিমোর ভাব দেখে বুঝতে পারলো লিও। বন্ধুকে থামিয়ে বললো, “বকাবকি শুরু করো না। নিশ্চই কোনো কারণ আছে এতো রাতে বের হওয়ার। যেমন তুমি বের হয়েছো।”
“ইয়ে… মানে… একটু তাড়াহুড়োয় ছিলাম তো, তাই কাউকে বলে আশা হয়নি” মাথা চুলকে বললো মিমো।
-তা কি এমন জরুরি বিষয় যার কারণে তোমাকে রাত দুটোর সময় বাইরে আসতে হলো? তাও আবার না বলে।
-সে কি? তুমি শোনোনি? নিকিকে সন্ধ্যার পর থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
-বলো কি? সন্ধ্যায় তা চারজনে একসাথে বাড়ি ফিরলে?
-ফিরেছিলাম ঠিকই। কিন্তু ও তো পরে বারোভাজা কিনতে বাজারে গিয়েছিলো। তারপর থেকেই উধাও।
-তাহলে বাজারে গিয়ে খুজোঁ। জঙ্গলে কি করছো?
-খুঁজেছি বাজারে। ওখানে না পেয়ে এখন ছড়িয়ে গেছি খোঁজায়। আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে ট্রি হাউসে খোঁজার। এমা আর রিঙ্কা গ্রামে খুঁজছে অন্যদের সাথে।
-এ তো বড়োই চিন্তার বিষয়।
বেশ চমৎকার ভাবে নিয়নকে পেঁচে ফেলছে মিমো। তাকে বিশ্বাস করছে বুঝতে পেরে অভিনয়ের ডোজটা আরো বাড়িয়ে দিলো মিমো।
“আন্ট মিলি চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছে জানো?” মুখে একটা দুঃখ দুঃখ ভাব ফুটিয়ে তুললো মিমো।
অমন দুঃখে ভরা মুখ দেখে নয়নের খারাপ লাগলো। সে মিমোর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, “চলো আমি তোমার সাথে খুঁজি।”
“এটাই তো চাই। এখন পেটুটা আসলে ঘুমিয়ে না পড়লেই হলো।” ভাবলো মিমো।
-লিও, তুমি তাহলে বাসায় যাও। আমি ওর বন্ধুকে খুঁজতে সাহায্য করি।
“আমি তোমাদের সাহায্য করতে পারি।” বললো লিও।
-না, পারো না। ওদিকে তোমার দুই ভাই অপেক্ষা করছে তোমার জন্য। তার ওপর তুমি সারাদিন জার্নি করেছো। এরপর দেখবে নিকিকে ছেড়ে তোমায় নিয়ে হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে আমাকে।
-তা ঠিক। আচ্ছা তাহলে আমি যাচ্ছি। কাল দেখা হবে।
বিদায় নিয়ে চলে গেলো লিও। মিমো আর নিয়ন ঢুকে গেলো জঙ্গলের দিকে। এখন মিমোর কাজ হলো যে করেই হোক নিয়নকে বাংলোর ভাঙা দেয়ালটার দিকে নিয়ে যাওয়া। বেশ ঘুরিয়ে সুরিয়ে নয়নকে নিকির কাছে নিয়ে আসলো মিমো। নিকির অবস্থা দেখে নিরাশ হলেও অবাক হলো না সে। মেয়েটা এই অবস্থায়ও নাকের গর্জন শুনিয়ে ঘুমাচ্ছে। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তার মশার কামড়ে ফুলে ওঠা চেহারা।
“আরে! ঐ যে নিকি। গাছের নিচে ঘুমাচ্ছে।” নজরে পড়ায় বলে উঠলো নিয়ন।
“হাহ! দেখেছো কান্ড! আমরা এদিকে খুঁজে খুঁজে পাগল হয়ে যাচ্ছি আর মহারানী এখানে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে?”
“এই নিকি! উঠো! এটা ঘুমানোর কোনো জায়গা হলো?” চিলের মতো চেঁচিয়ে উঠলো মিমো।
তড়াক করে উঠে বসলো নিকি। “কি হলো? তুমিই তো বললে।….”
-যেন তুমি এখন কয়টা বাজে? রাট দুটোর সময় কেউ এই জঙ্গলে এসে ঘুমায়? চলো এখন বাসায়। তোমাকে আন্ট মিলিই সোজা করবে।
-কি করবো? ঘুম চলে এসেছিলো। আর তুমিই তো বললে….
-কি বললাম আমি? বলার কি কিছু রেখেছো? তোমাকে নিয়ে আর পারলাম না।
নিকিকে টেনে তুললো মিমো। তারপর কাপড় ঝেড়ে দেয়ার ভান করে গলা নামিয়ে বললো,”এক গুমে প্ল্যান গুলিয়ে ফেললে? পিছে তাকিয়ে দেখো, পিছে জম দাঁড়িয়ে আছে।”
এতক্ষনে নিকির চোখে পড়লো নিয়ন। দেখে ঢোক গিললো সে। আর একটু হলেই ধরা পড়ছিলো ওর কারণে। কপালে যে আরো এক ডোজ শাস্তি লেখা আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
নিকিকে মিমোর লেকচার থেকে বাঁচানোর লক্ষে নিয়ন বললো, “থাক, এখন আর বকে লাভ নেই। যা হওয়ার তা তো হয়েই গিয়েছে। ও বরং আন্ট মিলির হাতেই ধোলাই খাক। এখন চলো বাসায়।”
একটা লম্বা নিঃশাস ছাড়লো নিকি। এখনকার মতো বেঁচে গেছে। তিনজনে চলতে লাগলো জঙ্গলের বাইরের দিকে। ভাঙা দেয়াল পার হতে না হতেই মিমো থেমে দাঁড়িয়ে বললো, “বো, ওটা লিও ভাইয়া না?”
“হুম। কিন্তু ও বাড়ির বাইরে কি করছে?” দেখতে পেরে বললো নিয়ন।
“মনে হয় ঢুকতে পারেনি। ঘুমিয়ে থাকার কারণে কেউ হয়তো দরজা খোলেনি।” হাই তুলে বললো নিকি।
“আমার মনে হয় তোমার একটু যেয়ে দেখা উচিৎ।” বললো মিমো।
নিয়ন একটু ভেবে বললো, “ঠিক আছে, আমি যেয়ে দেখি কি হয়েছে। তোমরা দুজন বাসায় চলে যাও।”
“হেঃ! বাসায়চলে যাবো? অসম্বব! এমন একটা ইন্টারেষ্টিং ব্যাপার ফেলে রেখে বাসায় গেলে লিলিপুট সন্ত্রাসীর নাম কাদা লেগে যাবে।” নিজ মনে বললো মিমো। তারপর একটু হেসে বললো, “ইয়ে… মানে… এক যেতে ভয় লাগবে। তার চেয়ে তোমার সাথেই থাকি?”
-একা আসতে পেরেছো, আর একা যেতে পারবে না?
-তখন তো বিষয়টা ভিন্ন ছিল। সে তুমি বুঝবে না। প্লিজ, তোমার সাথে থাকি?
-ঠিকাছে। কি জানি কি চলছে তোমার মাথায়?
নাক বচকে মিমোর দিকে তাকালো নিকি। “করছে তা কি মেয়েটা? কোনো ঝামেলায় পড়লে সব দোষ মিমো, রিঙ্কা আর এমার। আমি কিছু জানি না।” ভাবলো সে।
ভাঙা দেয়াল পার হয়ে বাংলোর দিকে এগিয়ে গেলো তিনজনে।
Comments
Post a Comment