ভৌতিক গবেষণা পর্ব-৯

 বেশ ভালো বাতাস পাওয়া যাচ্ছে চিলেকোঠার জানালা খুলে দেওয়াতে। একটা চৌকিতে গোল হয়ে বসেছে তিনজন। জনার্দন আর হোজেনের নিচে লিওর জন্য অপেক্ষা করছে। ইউনা জরুরি কাজে বাড়ি ফায়ার গেছে। তাই রাতের আড্ডার সঙ্গী এরা তিনজনই।

তিনজনের মাঝে হারিকেনটা রাখলো মিস. সোয়া। তারপর চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলা শুরু করলো, “তাহলে শুরুটা তাদের দল গঠন থেকেই করি।”
চুপচাপ মাথা নাড়লো দুই ভাই।

“এমা আর নিকি হলো ছোটবেলার সাথী। প্রায় হাফ প্যান্ট পরা বয়স থেকে একে অপরকে চেনে। এদিকে মিমো হচ্ছে নিকির দূর সম্পর্কের মামাতো বোন। ইঁচড়েপাকা বলে দোলে যোগ দিতে তার কোনো সমস্যা হয়নি। আর নামেই বুঝতে পারছো যে রুফাইদা হক এই দেশের না। সে এসেছে বাংলাদেশ থেকে, এই প্রায় সাত কি আট বছর আগে। বিজ্ঞানী হওয়ায় তারও দলে ঢুকতে সময় লাগেনি। এভাবে তাদের দোল তৈরি হয়।”

ভৌতিক গবেষণা পর্ব-৯

এক মত হলো লিন্ডো। রিঙ্কার চেহারায় বাঙালি ভাব আছে। কিন্তু কথায় তা সহজে বোঝা যায়না।

“আচ্ছা? তুমি যে বললে মিমো সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী। কোথায়? আমি তো দেখলাম সে বেশ মজার একজন মানুষ। হ্যা, একটু মারামারি করে। কিন্তু তার বাকি সবকিছুই তো চমৎকার। “


-হু হু বাবা… কেবল তো পরিচয় হয়েছে তোমাদের। কিছুদিন পর দেখবে মিমোর জ্বালা কাকে বলে।
এবারও কিছু বুঝলোনা লিন্ডো।

“আচ্ছা, রিঙ্কা নামের মেয়েটা কি আসলেই বিজ্ঞানী?” জিজ্ঞেস করলো রবিন।
-বিজ্ঞানী তো বটেই।
-কি কি বানিয়েছে?

“সেটা নিয়ে পরে রিঙ্কার সাথেই কথা বলো। এখন ওদের লিলিপুট সন্ত্রাসী নাম পাওয়ার ঘটনাগুলো শুনো।” রবিনকে বাধা দিলো লিন্ডো। আবিষ্কার টাবিষ্কারের কথায় তার একদমই আগ্রহণ নেই। উল্টো মাথায় কেমন যেন প্যাঁচ লেগে যায় বুঝতে গেলে।
“সেটাই ভালো। আর আবিষ্কারের বিবরণ আবিষ্কারক নিজেই ভালো বলতে পারবে।” বলে চায়ে আরো একটা চুমুক দিলো মিস. সোয়া।

“নিকি আর মিমো শুরু থেকেই বাঁদর ছিল। কিন্তু ওদের আসল বাঁদরামো শুরু হয় যখন ওরা ক্লাস ফোর কি ফাইভে পড়ে তখন থেকে। আমি যেই স্কুলে চাকরি করে সেটা এখন এই দেশের সবচেয়ে বড় স্কুলের একটি। কিন্তু আগে স্কুলটা এতো বড় ছিল না। প্রিন্সিপাল ছিল কোনোমতে ডিগ্ৰী পাওয়া একজন। না ছিল তার কাজের খেয়াল না ছিল ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে কোনো চিন্তা। কোনো স্কলারশিপের ব্যবস্থাও ছিলোনা। শিক্ষকদের ও কোনো মাথা বেথা ছিল না এ নিয়ে। তাই না হতো কোনো পড়ালেখা না হতো কোনো শিক্ষার বিকাশ তো দূরের কথা। স্কুল টাইম সবাই ক্লাসে ঘুমাতো। এক কথায় জঘন্য স্কুল।”

“এতো বাজে স্কুল একটু ভালো হলো কি করে?” রবিনের প্রশ্ন।
“সেটাই তো গল্প। গল্প শুরু হয়ে পারলো না, আর ইনি প্রশ্নে ডুবে যাচ্ছে। এতো বাগড়া দিও না তো।” বিরক্তির স্বরে বললো লিন্ডো।

আবার বলতে শুরু করলো মিস. সোয়া-

“তবে এই স্কুল জনিত সমস্যা নিয়ে এমা, মিমো, নিকি আর রিঙ্কার কোনো মাথা বেথা ছিল না। এমা আর মিমো বরাবরই মেধাবী। রিঙ্কা ইতিহাস লিটারেচারে দুর্বল হলেই বিজ্ঞান বিষয়ে তার অনেক জ্ঞান। আর নিকি? দলের তিনজন পড়ায় আগ্রহ দেখায় বলে চাপে পরে সেও পড়ায় মন দিতো। সব কিছু ভালোই চলছিল। কিন্তু ঝামেলাটা শুরু হলো তখন যখন স্কুলের বেতন হটাৎ করে বেড়ে গেলো। বেতন বাড়ার কারণে অনেক স্টুডেন্ট স্কুল ছেড়ে দিলো। এলাকায় আর কোনো স্কুল না থাকায় অনেকে তো পড়ালেখায় ছেড়ে দিয়েছিলো। এর মধ্যে আমিও একজন ছিলাম। আর ছিল দলের লিডার এমা হেইসন।”

“কি খারাপ! এভাবে কেউ বেতন বাড়ায়? নিশ্চই ওই বাজে প্রিন্সিপালের কাজ। বেটা লোভী কোথাকার।” বলে উঠলো লিন্ডো।
“ঠিক ধরেছো।” হেসে বললো মিস. সোয়া।
“এবার বাগড়াটা কে দিচ্ছে শুনি?” বাঁকা হেসে লিন্ডোর দিকে তাকালো রবিন।
-থাক আর খোটা দিতে হবে না। তার চেয়ে গল্প শুনো।
মুখ ফুলিয়ে মাথা নাড়লো রবিন।
-তো যেটা বলছিলাম,

“এমার বাবা নেই। ওর মা মিসেস. হেইসন একটা ছোট্ট বেকারি চালিয়ে এমার লেখাপড়ার খরচ দিচ্ছিলো। কিন্তু বেতন বাড়ায় সেটা দেয়া অসম্ভব হয়ে যায়। তাই এমাকে পড়ালেখা ছাড়তে হয়। এমা স্কুল ছেড়ে যাবে বিষয়টা কেউই মেনে নিতে পারলো না। বিশেষ করে নিকি। ওর ছোটবেলার বন্ধু বলে কথা। এই সমস্যার সমাধান করার জন্য মিমো, রিঙ্কা আর নিকি তাদের পরিবারের সাথে কথা বলে কিন্তু কোনো লাভ হয় না। ছোট মানুষ ভেবে অনেকটা উড়িয়েই দেয়া হয় তাদের।”

“শেষমেশ কোনো উপায় না পেয়ে আমাদের পেঁচানো বুদ্ধির ঢেরা মাদ্রিওজেস গঞ্জালভেস ওরফে মিমো একটা উদ্ভট পরিক্লপনা করে। আর তাদের মূল লক্ষ্য, স্কুলের অবস্থাটা যে করেই হোক বড়োদের নজরে আনা। আর প্ল্যাটটা এই যে….”
থেমে গেলো মিস. সোয়া। নিচে ঘড়িটা ঢংঢং শব্দ করছে। বুঝিয়ে দিচ্ছে যে এখন রাত বারোটা বাজে।
“দেখেছো! মাঝ রাত হয়ে গেছে। আর গল্প নয়। এখন শুতে যাবে চলো।” বলে মিস. সোয়া চায়ের কাপ আর কেটলি তুলে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।
মুখ বাকিয়ে পড়লো লিন্ডো আর রবিনের।

“এভাবে বললে চলবে না। কান্ডটা কি করলো সেটা তো বললেই না।” বললো লিন্ডো।
-সময় তো আর শেষ হয়ে যাচ্ছে না। বাকিটা কালকে বলবো। এখন চলো ঘুমাতে।
লিন্ডো উঠলোনা। ঘাড় নাচিয়ে বললো, “অন্তত প্ল্যানটা কি ছিল সেটা তো বলে যাও।”
-উঁহু…. কোনো কথা নয়। এখন দাঁত মেজে সোজা বিছানায়। তারপর ঘুম।
বলে নিচে চলে গেলো মিস. সোয়া। নিচে নেমে সোজা রান্নাঘরে চলে গেলো সে। অনিচ্ছায় তার পিছু নিলো দুই ভাই।

সোফায় বসে ঝিমাচ্ছে হোজেন। তার পাশে বসে জনার্দন পত্রিকা পড়ছে।

“কি হলো? আড্ডা শেষ?” রবিন আর লিন্ডোকে নিচে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করলো সে।
“শেষ তো আর করতে চাইনি। কিন্তু ঘড়ির শব্দ শুনে মিস. সোয়া থামিয়ে দিয়ে আমাদের ঘুমাতে যেতে বললো।” অভিমানের স্বরে বললো রবিন।
লিন্ডো রবিনের সাথে তাল মিলিয়ে বললো, “আর বলো না আঙ্কেল। গল্পটা বললোই না বলা যায়। শুধু ক্রাইসিসের অংশটুকু ধরিয়ে দিলো।”
-হুম! হুম! প্ল্যানটাও বললো না।

ছোট বাচ্চাদের মতো নালিশ করলে লাগলো দুই ভাই। তাদের দেখে হাসলো জনার্দন। মনে মনে খুশিও হলো সে। রবিন আর লিন্ডোকে খুব কমেই এমন আনন্দ আর উৎসাহের মধ্যে দেখা যায়।

“এ কি? তোমরা এখনো ঘুমাতে যায়নি?” রান্নাঘর থেকে মাথা বের করে বললো মিস. সোয়া।
“আর একটু পরে যাই? ভাইয়া আসলেই দেখা করেই ঘুমাতে যাবো। প্রমিস!”

নিঃশাস ফেললো মিস. সোয়া। বললো, “ঠিক আছে। আর আধ ঘন্টা সময় দিচ্ছি। তারপর কিন্তু আর কোনো কথা শুনবো না। সোজা ঘুমাতে যেতে হবে।”
“একটু রাত জাগলে কি হবে?” ঠোঁট উল্টে জিজ্ঞেস করলে রবিন।
-একদিন পান্ডা হয়ে যাবে।
“পান্ডা!?” একসাথে বলে উঠলো দুই ভাই। মুখের উপর অবিশ্বাসের ভাব।
দেখে হাসলো মিস. সোয়া। তারপর আবার রান্নাঘরে ঢুকে গেলো।

Comments

Popular Posts