ভৌতিক গবেষণা পর্ব-২
রাত তখন বারোটার কাছাকাছি। লিন্ডো গভীর ঘুমে মগ্ন। পাশে রবিন আধশোয়া হয়ে তার ল্যাপটপে একটা প্রোগ্রামে কাজ করছে।
“আহ! তুলনা নেই আমার। ইচ্ছে হচ্ছে নিজেই নিজের পিঠটা একটু চাপড়ে দেই। এই প্রোগ্রামটা দিয়ে আমি সবাইকে তাক লাগিয়ে দিবো। সবাই তখন দেখবে এই রবিন প্রোগ্রামার কি পারে।” ভেবে হাসলো রবিন। কাজ শেষ করে ল্যাপটপটা পাশের টেবিলে রেখে বিছানা থেকে নামলো সে। তারপর কেমন অদ্ভুত ভাবে নাচা শুরু করলো। তবে তার একক নৃত্য বেশিক্ষণ চলোনা। কাছেই কোথাও কাচ ভাঙার শব্দে নৃত্যে বিরাম ঘটলো। ” কি ভাঙ্গলো? আমি কিছু করলাম নাকি? নাকি ভূতের কাজ?” ভাবলো রবিন। পর মুহূর্তে মাথা নাড়লো।”ভাইয়া বলেছে, ভয় আসলে মনের মধ্যে। শান্ত হও রবিন।”নিজেকে বোঝালো সে। তারপর আলো নিভিয়ে লিন্ডোর পাশে শুয়ে পড়লো।
রবিনের প্রায় ঘুমই চলে এসেছিল। ঠিক তখন সে তন্দ্রার মাঝে শুনতে পেলো কেমন একটা খসখস শব্দ। প্রথমে ভাবলো মনের ভুল। কিন্তু কিছুক্ষন পর আবার শোনা গেলো সেই শব্দ। এবার ঠিক দরোজার বাইরে। চমকে উঠে বসলো সে| লিন্ডোকে গুতিয়ে বললো,” এই লিন্ডো। এই! উঠো!”
“উম! কি? ঘুমাতে দেও।” বিড়বিড় করে বললো লিন্ডো।
-উঠো তো, শুনতে পারছোনা? ঘরের বাইরে কে যেন হাটঁছে।
-জন আঙ্কেল অথবা হোজেন চাচা হবে হয়তো।
-না। কোনো আঙ্কেল না। শুনে দেখো, অমন করে কোনো আঙ্কেলই হাঁটেনা।
লিন্ডো জাগা তো দূরের কথা, একটু নড়লো পর্যন্ত না।
এবার রবিনের একটু রাগ হলো। অধৈর্য হয়ে লিন্ডোকে ধরে ঝাকিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,” ওরে আমার ঘুমন্ত কুমার! এখন না উঠলে আর কখনই উঠতে পারবেনা। ভূতে এসে সারা জীবনের জন্য তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিবে। উঠো !”
বিরক্ত হয়ে উঠে বসলো লিন্ডো। চোখ ডলে আলো জ্বালিয়ে বললো,”মাঝ রাতে তোমার এই ভূত ভূতানি কি না করলেই নয়?”
-আমাকে কথা না শুনিয়ে আগে একটু কানটা পেতে শোনো।
_ বলেছিনা তোমার……
থেমে গেলো লিন্ডো। আসলেই তো! পায়ের শব্দ তো শোনা যাচ্ছে ঠিকই। তাও আবার সাধারণ হাঁটা নয়। স্যান্ডেলের তোলা ঘেষিয়ে হাঁটা। এমন করে জন বা হোজেন আঙ্কেল কেন,তার চেনা কোনো আঙ্কেলই হাঁটেন।
শুনে মনে হচ্ছে ঘরের সামনে পায়চারি করছে কেউ।
তড়াক করে বিছানা থেকে নামলো লিন্ডো। দরোজায় কান পেতে শুনলো সে। কোনো সন্দেহ নেই যে মানুষটাকে সে চেনেনা। আবার বিছানার পাশে এসে বললো,”চোর এসেছে। নিশ্চই এই বাড়িতে গুপ্তধন আছে যেটা সে চুরি করতে এসেছে। চলো গিয়ে ধরি।”
রবিন কাঁথা মুড়ি দিয়ে বললো,” ইশ! তুমি কি পাগলে হয়েছো? আমি পারবোনা যেতে। এই অন্ধকারে বিছানা থেকেই নামতে পারবো না আমি।”
-তাহলে তুমি থাকো,আমি চোরটাকে পিটিয়ে আসি|
-এই না! একদম না। আমি এক থাকতে পারবোনা।
-তাহলে চুপচাপ চলো আমার সাথে। নাহলে চোরের আগে তোমাকেই পিটাবো।
নাক কুঁচকালো রবিন। এখন তাকে যেতেই হবে। দেখতে হালকা পাতলা হলেও লিন্ডোর গায়ে জোর আছে। ওর থেকে ভূতের হাতে পটল তোলা ঢের ভালো। ভীত মনে লিন্ডোর শার্টের কোনা টেনে ধরলো রবিন। তারপর দুজনে বের হয়ে গেলো ঘর থেকে। হোসেন আর জনার্দনের ঘর পার হয়ে এগিয়ে গেল বারান্দার দিকে।
এই গরমেও রবিন ঠক ঠক করে কাঁপছে। কাঁপার কারণও আছে। সামনে বিশাল করিডোর। তার ঐ মাথায় ময়লা পরা বাল্ব ঝুলে আছে যা আলোর নাম অপমান দিচ্ছে। এতো অল্প আলোয় অন্ধকারটা আরো বেশি বেশি লাগছে। পায়ের কাছে যেন ইঁদুর এর আরশোলার মিছিল চলছে। এই অবস্থায় রবিনের জন্য ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক।
লিন্ডোর ব্যাপারটা আলাদা। রহস্যের গন্ধ পেয়েছে সে।
মনে মনে ভাবছে,”আগে এসে ভালোই করেছি। এখন চোর পেটাবো। এরপর গুপ্তধন খুঁজে যা পাবো তা দিয়ে মিশরে যাবো। সেখানে গিয়ে একটা নতুন পিরামিড খুঁজবো। বিখ্যাত হবো পুরো পৃথিবীতে। আহ! কত নাম হবে আমার!”
মনের অজান্তেই লিন্ডো খ্যাঁক করে হেসে একটা তুড়ি বাজিয়ে দিলো।
“কি হলো!? কি হলো?! পাগল না ভূতে ধরেছে?!” চেচিয়ে লিন্ডোর থেকে দূরে সরে গেলো রবিন।
লিন্ডো রবিনের মুখ চেপে ধরে বললো,”চেঁচাচ্ছ কেন? চোরটা টের পেয়ে যাবে তো।”
“চেঁচাবো না তো কি নাচবো? অমন করে তুড়ি বাজালে কেন?” লিন্ডোর হাত ঠেলে সরিয়ে দিলো রবিন।
-সে অন্য কথা ভাবছিলাম। তুমি বুঝবে না।
-এই অবস্থায় তোমার মাথা অন্য কথা আসে কিভাবে? এদিকে আমি আমার কচি জীবনটা হাতে নিয়ে কোনোমতে চলছি আর তুমি তুড়ি বাজিয়ে হাসছো?
-বললাম তো, তুমি বুঝবে না।
-বোঝার ইচ্ছে ও নেই। আমি আর তোমার সাথে যাবে না। আমাকে জন আঙ্কেলের কাছে দিয়ে আসো। তারপর তুমি যা ইচ্ছে করো গিয়ে।
-ঠিকাছে, চলো তোমার কচি জীবনটা বাঁচিয়ে আসি।
Comments
Post a Comment